ডেস্ক রিপোর্ট: জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে রংপুরের ৬টি আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীরা মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। দলীয় ও সামাজিক সভা-সমাবেশ এবং জনকল্যাণকর কাজে সম্পৃক্ত হয়ে ভোট চাইছেন তারা। তিস্তা নদী বেষ্টিত রংপুর-১ (গঙ্গাচড়া) আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি। কৃষিপ্রধান এ আসনের হাজারো মানুষ বন্যা ও নদীভাঙনে সর্বস্বান্ত হয় প্রতি বছর। নদীভাঙন, বন্যা, বেকারত্বকে কেন্দ্র করে চলে এ আসনের রাজনীতি।
জাতীয় নির্বাচনের আগে সম্ভাব্য প্রার্থীরা তাদের উন্নয়ন কর্মপরিকল্পনার কথা তুলে ভোটারদের কাছে ভোট চান।
জাতীয় পার্টির দুর্গ বলে খ্যাত গঙ্গাচড়া আসনটি ১৯৯০ সালের পর থেকে জাতীয় পার্টির রয়েছে। এবারও জাতীয় পার্টি গঙ্গাচড়া-১ আসনটি তাদের দখলেই রাখতে চায়। এদিকে বর্তমান সরকারি দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এ আসনটি তাদের দখলে আনতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তারা বলছেন, আওয়ামী লীগ-জাতীয় পার্টি জোট হলেও এ আসনে জোটের প্রার্থী না দিয়ে উন্মুক্ত করে দেওয়া হোক। ভোটাররা স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে জয়ী করতে মুখিয়ে আছেন। যদিও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এ আসনে এখনও প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়নি। হিসাব বলে, জোটগত নির্বাচন হলে এ আসনটি এবারও জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দিতে পারে আওয়ামী লীগ।
২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এ আসনে জয়লাভ করেন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য রংপুর জেলা সভাপতি মসিউর রহমান রাঙ্গা। বর্তমানে তিনি সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। নির্বাচনের পর থেকে তিনি সর্বাধিকবার তার সংসদীয় এলাকায় এসে ভোটারদের খোঁজ-খবর নিয়েছেন। রাস্তাঘাট নির্মাণ, সংস্কার, মসজিদ-মন্দির নির্মাণ-উন্নয়ন, খেলার মাঠ উন্নয়ন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, প্রশাসনিক অবকাঠামো, গঙ্গাচড়ার হতদরিদ্র জীবনমান উন্নয়ন, বেকার সমস্যা সমাধান ও নদীভাঙন রোধে বড় প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করেছেন। তবে নদীভাঙন রোধ, নদী শাসনে ধীরগতিতে কাজ ও রাস্তাঘাট নির্মাণ নিয়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। নির্বাচনী প্রচারের অংশ হিসেবে হেভিওয়েট প্রার্থী মসিউর রহমান রাঙ্গা গঙ্গাচড়ার প্রতিটি ইউনিয়নে গিয়ে মানুষের কাছে ভোট চাইছেন। তার সময়কার বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে লাগিয়েছেন বড় বড় ব্যানার। সেই সঙ্গে ঈদ-পূজাকে কেন্দ্র করে গঙ্গাচড়াবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে টানিয়েছেন ব্যানার-ফেস্টুন। নির্বাচনে জয়লাভ করতে চলছে তার ডিজিটাল প্রচারণাও, ফেসবুক লাইভ, বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের পোস্ট দিচ্ছেন নিয়মিত। গত ঈদুল আজহায় গঙ্গাচড়ার আলমবিদিতর ঈদগাহ মাঠে ঈদের জামাতে অংশ নিয়ে আগামী নির্বাচনে ভোট দিয়ে গঙ্গাচড়ার উন্নয়ন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে আমি গঙ্গাচড়ার এমপি হওয়ার পর দেশের অন্যান্য এলাকার এমপির চেয়ে আমার নির্বাচনী এলাকায় আমি সবচেয়ে বেশি এসেছি এবং জনগণের খোঁজ-খবর নিয়েছি। সরকারের সুষম উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে কাজ করে চলেছি। গঙ্গাচড়া আসনের রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ-মন্দির, ব্রিজ-কালভার্ট তৈরি করেছি। গঙ্গাচড়ার বেকার সমস্যা সমাধানে ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির আওতায় হাজার হাজার তরুণ-তরুণীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। অনেকের কর্মসংস্থানের সুযোগও হয়েছে। গঙ্গচড়ার মানুষের বড় সমস্যা নদী শাসনে আমি সরকারের কাছে ১২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে বরাদ্দ এনে ডান তীরে বাঁধ নির্মাণ কাজ করেছি। এ ছাড়া আরও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড তো রয়েছেই। তাই আমি আশা করি, গঙ্গাচড়াবাসীর সমর্থন ও ভালোবাসা রয়েছে আমার প্রতি। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণ আমাকে বিপুল ভোটে জয়ী করবে।
এদিকে এই আসনে আগামীবার স্থানীয় আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকে মনোনয়ন দেওয়ার দাবিতে একাট্টা হয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়ন কাজগুলো তাদের দলের লোকদের হাত দিয়েই হোক- এমনটি চান নেতাকর্মীরা। সে জন্য কেন্দ্র থেকে যাকেই মনোনয়ন দেওয়া হোক তার পেছনে থেকে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা কাজ করবে বলে জানান সম্ভাব্য প্রার্থীরা। আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে মাঠে আছেন গঙ্গাচড়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা আসাদুজ্জামান বাবলু, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক রুহুল আমিন, স্বতন্ত্র হিসেবে তৎপরতা চালাচ্ছেন শিল্পপতি সিএম সাদিক। এ ছাড়াও জাপা চেয়ারম্যান এরশাদের ভাতিজা গঙ্গাচড়া আসনের সাবেক সাংসদ হুসেইন মকবুল শাহরিয়ার আসিফের নির্বাচন করার কথা শোনা যাচ্ছে।
সরকারের নির্বাচন কৌশলে জোটের প্রার্থী দেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। জোটের প্রার্থী না হয়ে নির্বাচন হলে এ আসনে বর্তমান সাংসদ মসিউর রহমান রাঙ্গার বিজয় লাভ করা একটু কষ্টকর হবে বলে ধারণা সাধারণ মানুষের। বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান বাবলুকে গত উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন না দিলেও তিনি আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে জয়লাভ করেন। জাপা সাংসদ মসিউর রহমান রাঙ্গার পাশাপাশি তিনিও বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থেকে ভোটারদের কাছে বর্তমান সরকারের উন্নয়নের ফিরিস্তি তুলে ধরেন। রাঙ্গার শক্ত প্রতিপক্ষ হিসেবে বাবলুকেই দেখা হচ্ছে।
আসাদুজ্জামান বাবলু বলেন, বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী রংপুরের পুত্রবধূ। রংপুরের উন্নয়নে তিনি ব্যাপক কাজ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গঙ্গাচড়ায় এসে নিজে এলাকার মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দেখে গেছেন। তিনি গঙ্গাচড়াবাসীর দুর্দশার কথা ভেবে নদী শাসনের জন্য বিশেষভাবে অর্থ বরাদ্দ করেছেন। উন্নয়নের সরকার আওয়ামী লীগ গঙ্গাচড়াবাসীর উন্নয়ন করলেও এখানে প্রতিনিধিত্ব করছেন অন্য দলের এমপি। এ আসনের মানুষ স্থানীয় মানুষকে এমপি হিসেবে দেখতে চায়। আমি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী দেওয়ার জন্য বলেছি। জোট হলেও জোটের প্রার্থী না দিয়ে এ আসনটি উন্মুক্ত করে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছি। নৌকা মার্কা আমাকে বা অন্য যে কাউকে দেওয়া হোক আমি ও আমার সমর্থকরা দিনরাত কাজ করে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে বিজয়ী করার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ।
গঙ্গাচড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক রুহুল আমীন জানান, এই আসনে আওয়ামী লীগের বিকল্প নেই। আগামী নির্বাচনে গঙ্গচড়ায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী বিপুল ভোটে নির্বাচিত হবেন।
এদিকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদের ভাতিজা হোসেন মকবুল শাহরিয়ার ২০১৪ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন আড়াই হাজারের বেশি ভোটারের স্বাক্ষর নিয়ে। কিন্তু পরিবেশ অনুকূলে না থাকায় নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি। ফলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন জাপা প্রার্থী মসিউর রহমান রাঙ্গা। আসিফ বলেন, গঙ্গাচড়া উপজেলার প্রতিটি ওয়ার্ডে আমার ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। দল যদি মনোনয়ন না দেয় তাহলে আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে গঙ্গাচড়া থেকে নির্বাচন করব এবং নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করে গঙ্গাচড়াবাসীর উন্নয়ন করব।
জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের চেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে বিএনপি। তাই এ আসনে বিএনপির প্রার্থী তেমন আলোচনায় নেই। নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থান বিএনপির জয়লাভের জন্য একটি ভালো পরিবেশ তৈরি করবে মনে করছেন বিএনপি নেতারা। বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি ওয়াহেদুজ্জামান মাবু। তিনি বলেন, এ আসনে মানুষের এরশাদের প্রতি আবেগ শেষ হয়ে গেছে। জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে রেষারেষির কারণে বিএনপির অবস্থা তুলনামূলক ভালো। জনগণ এ সরকারকে আর ক্ষমতায় দেখতে চায় না। বিএনপি যদি নির্বাচনে অংশ নেয় ও সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকই জয়লাভ করবে।
এদিকে 'ভাড়াটিয়া হটাও, গঙ্গাচড়া বাঁচাও' স্লোগান নিয়ে গঙ্গাচড়ার শিল্পপতি সিএম সাদিক তার নির্বাচনী প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন । সূত্র: সমকাল