মৃত্যুর আরও কাছে সাকা

13748515331-400x482প্রভাষ আমিন : ফাঁসির রশির দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেয়া ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে সাকার আপিল খারিজ করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এরপর শুধু রিভিউ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমাভিক্ষাসহ অল্প কিছু আনুষ্ঠানিকতা বাকি। তারপরই পতন ঘটবে বাংলাদেশের রাজনীতির এক কুখ্যাত চরিত্রের, যে একাধারে যুদ্ধাপরাধী ও ভাঁড়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ১-এর ২০১৩ সালে দেয়া রায়ে ২৩টি অভিযোগের মধ্যে ৯টিতে সাকা চৌধুরীর সংশ্লিষ্টতা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। চারটি অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড, তিনটিতে ২০ বছর করে ও দুটিতে ৫ বছর করে কারাদণ্ড দেয়া হয়। আপিল বিভাগ ট্রাইব্যুনালের ৯টির মধ্যে ৮টির সাজাই বহাল রাখেন। আপিল বিভাগ প্রার্থনারত অবস্থায় কুন্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা নুতন চন্দ্র সিংহকে হত্যা, রাউজানের সুলতানপুরের বণিকপাড়ায় নেপাল চন্দ্র ধরসহ চারজনকে হত্যা, ঊনসত্তরপাড়ায় গণহত্যা এবং আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মোজাফফর আহমেদ ও তার ছেলে শেখ আলমগীর হত্যার দায়ে সাকার সর্বোচ্চ সাজা বহাল রাখেন। ট্রাইব্যুনাল বিচার করেছে তার একাত্তরের সময়কার মানবতাবিরোধী অপরাধের। তবে স্বাধীনতার পরে তার অপরাধও কম নয়। ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে থেকে কলুষিত করে গেছে বাংলাদেশের রাজনীতিকেই। সাকার রায়ে আরেকটা বিষয় পরিষ্কার হলো, সব দম্ভেরই পতন হবে।
সাকা চৌধুরীকে বলা যায়, বাপকা ব্যাটা। কুখ্যাত ফকা চৌধুরীর (ফজলুল কাদের চৌধুরী) যোগ্য ছেলে সাকা। ফকা যেখানে শেষ করেছে, সাকা সেখান থেকেই শুরু করেছে যেন। একাত্তরে রাজাকার ছিল অনেকেই, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে অনেকেই। কিন্তু তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনকদের তালিকা করলে সাকার নাম থাকবে উপরের দিকেই। একাত্তরে চট্টগ্রামের মানুষের আতঙ্ক ছিল ফকা আর সাকা। আর তাদের গুড হিলের বাসার মতো এমন ‘বেড’ বাসা বাংলাদেশে দ্বিতীয়টি নেই। একাত্তরে এটি ছিল টর্চার সেল। স্বাধীনতার পর দৈনিক বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ‘ফকা চৌধুরী ২৫ মার্চের পর থেকে চাটগাঁয়ে অত্যাচারের যে স্টিম রোলার চালিয়েছিলেন, আইখম্যান বেঁচে থাকলে এ অত্যাচার দেখে নিশ্চয়ই তাকে স্যালুট দিত। ফজলুল কাদের চৌধুরী গুড হিলস্থ বাসায় আজ স্থাপিত হয়েছে মুক্তিফৌজের শিবির। পোল্যান্ডের লোকেরা নাৎসী বন্দিশিবিরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আজও যে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে, চৌধুরীদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় চাটগাঁয়ের লোকেরা অনুরূপ দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে।’ শুধু একাত্তরে নয়, গুড হিলের সেই বাসা আজও মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরি করে। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ও কবি সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় গণতদন্ত কমিশনের তদন্তেও সাকার বিভিন্ন অপরাধের চিত্র বেরিয়ে আসে। ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি দৈনিক বাংলায় ফকা-সাকার অপরাধ সম্পর্কে লেখা হয়েছিল, ‘সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী আর তার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর গুড সাহেবের হিলস্থ বাসায় মরহুম ড. সানাউল্লাহর এক ছেলেসহ চাটগাঁর কয়েকশ ছেলেকে ধরে এনে নির্মম অত্যাচার করত। ১৭ জুলাই ১৯৭১ এ ছাত্রনেতা ফারুককে ধরে এনে পাক বাহিনীর সহায়তায় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী হত্যা করেন। ২৬ মার্চ থেকে আত্মসমর্পণের পূর্ব পর্যন্ত সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীদের বাসায় পাক বাহিনীর এক প্লাটুন সৈন্য মোতায়েন থাকত। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, ফজলুল কাদের চৌধুরীসহ তাদের পরিবার প্রায় দেড়মণ সোনাসহ পালানোর সময় মুক্তিবাহিনীর কাছে গত ১৮ ডিসেম্বর ’৭১ ধরা পড়েন।’
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৭ জন অধ্যাপক সস্ত্রীক আশ্রয় নিয়েছিলেন চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ব্যক্তি শ্রী কুন্ডেশ্বরী ঔষধালয় এবং কুন্ডেশ্বরী বিদ্যাপীঠের প্রতিষ্ঠাতা বাবু নতুন চন্দ্র সিংহের বাসায়। সেখান থেকে ভারত যাওয়ার পথে তারা নতুন চন্দ্রকেও যেতে বলেছিলেন। কিন্তু জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘যদি মরতে হয় দেশের মাটিতেই মরব।’ সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী তাকে বাঁচতে দেননি। ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল চারটি ট্যাঙ্কসহ দুটি জিপে করে পাকবাহিনী গহিরার কুন্ডেশ্বরী ভবনে আসে। তার একটিতে ছিল সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী। আগেই টের পেয়ে নতুন চন্দ্র সিংহ সবাইকে সরিয়ে দিয়ে নিজে প্রাঙ্গণে টেবিল চেয়ার পেতে পাক হানাদারদের জন্য অপেক্ষা করেন। সেনারা আসার পর নতুন চন্দ্র সিংহ তার বিভিন্ন কাজের বিবরণ দিলে তারা সন্তুষ্ট হয়ে ফিরে যাচ্ছিলেন। কিন্তু সাকা তাদের ফিরিয়ে এনে বলে, বাবা বলেছে এই মালাউনকে আস্ত রাখা চলবে না। সেদিন বীরত্ব ছিল, যাদের হাতে অস্ত্র তাদের নয়, বীরত্ব ছিল সম্পূর্ণ নিরস্ত্র ৭০ বছর বয়স্ক এ বৃদ্ধের। তিনি মন্দিরের সামনে বিগ্রহের দৃষ্টির সামনে সম্পূর্ণ আত্মস্থ হয়ে দাঁড়ালেন। সেনাবাহিনীর মেজর তাকে তিনটি গুলি করে। একটি গুলি তার চোখের নিচে বিদ্ধ হয়, একটি গুলি তার হাতে লাগে আর তৃতীয়টি তার বুক ভেদ করে চলে যায়। মেজরের তিনটি গুলির পর সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী নিজের রিভলবার দিয়ে তাকে আরও তিনটি গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে। মায়ের নাম নিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন নতুন চন্দ্র সিংহ। সৈন্যরা ট্যাঙ্কের গোলা দিয়ে তার বিদ্যা মন্দিরটিও উড়িয়ে দিয়ে যায়। দানবীর নতুন চন্দ্রের মৃত্যুতে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সবাই কেঁদেছে। সাকা মুসলমানদের তাদের সান্ত্বনা দিয়ে বলেছে ‘মালাউন মলো তোমরা শোক কচ্ছো কেন।’
১৯৭২ সালে নতুন চন্দ্র সিংহ হত্যা মামলা হয়েছিল। মামলার আসামিদের মধ্যে সালাহউদ্দিন কাদেরসহ ৫ জন ছিল পলাতক। আর তার পিতা ফকাসহ ৫ জন ছিল কারাগারে। কারাগারেই মরে যায় ফকা। সেই মামলায় সাকা চৌধুরীসহ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন পর দেশে ফিরে সাকার যেখানে কারাগারে যাওয়ার কথা ছিল, সেখানে এরশাদ তাকে মন্ত্রিসভায় ঠাঁই দেন। এরশাদের হাত ধরেই তার অত্যাচারের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয়। এরশাদ পতনের পর সাকা এনডিপি নামে একটি দল গঠন করে। নামে রাজনৈতিক দল হলেও এনডিপি আসলে ছিল সন্ত্রাসীদের আশ্রয় কেন্দ্র। এনডিপি বিলুপ্ত হয়ে গেছে অনেক আগেই। কিন্তু চট্টগ্রামে এখনও পুলিশের খাতায় সন্ত্রাসীদের পরিচয় হিসেবে ‘এনডিপি’ লেখা হয়।
রাজনীতিতে পেশিতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কৃতিত্ব ফকা চৌধুরীর। তার দেহরক্ষী শুকুর সবসময় তার কাছাকাছিই থাকত। কারও কোনো কথা অপছন্দ হলেই ফকা নাকি হাক দিত, শুকুয্যা কডে। সাকা সেই স্টাইলে আধুনিকতা এনেছে। শুধু যে সন্ত্রাস, মাস্তানি; তাই নয় চোরাচালান, নির্বাচনি ব্যবস্থাকে ভূলুণ্ঠিত করার কৃতিত্বও আছে সাকার। প্রচলিত আছে, নির্বাচনের আগে সাকা এলাকায় সংখ্যালঘুদের বাড়িতে গিয়ে বলেন, আপনারা তো নিশ্চয়ই আমাকেই ভোট দেবেন। ভয়ে সবাই চুপ করে থাকলে সাকা আবার বলত, বুঝেছি আমাকেই ভোট দেবেন। ভোট আমি পেয়ে গেছি। আপনাদের আর কষ্ট করে কেন্দ্রে যেতে হবে না।
এনডিপি নিয়ে সাকা চৌধুরী বিএনপির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন আন্দোলন করেছে। তখন সে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অনেক আজেবাজে কথা বলেছে। অথচ খালেদা জিয়া সেই সাকাকেই দলে টেনে নিয়েছিলেন। বিএনপিতে এসেও সে বিএনপির প্রগতিশীল, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অংশটির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে। প্রকাশ্যে সংগঠনবিরোধী বক্তব্য দেওয়ার অপরাধে তাকে একাধিকবার দল থেকে বের করে দেওয়া হয়।
আবার ফিরেও আসে। মনে হচ্ছে বিএনপি নেতা হিসেবেই মরবে এই যুদ্ধাপরাধী। তবে বাংলাদেশের রাজনীতি অবশ্যই সাকাকে মিস করবে। তার খ্যাক খ্যাক হাসি, মানুষকে হেয় করার অনুকরণীয় ভঙ্গি, আর কোথায় পাওয়া যাবে, কে করবে? লেখক : সাংবাদিক। সম্পাদনা : আনোয়ার